স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার, প্রত্যাশা ছিল ভালো ফলাফলের। কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউবা উচ্চশিক্ষিত হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় এবারের ফলাফলে ফুটে উঠেছে হতাশার চিত্র। পাসের হার মাত্র ৩৬.৯৪ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ১২৩ জন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েও পাস করতে পারেনি একজন শিক্ষার্থীও।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৪৮.০৪ শতাংশ হলেও নবীনগরে পাসের হার ৩৬.৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ বোর্ডের গড় ফলাফলের চেয়ে ১১.১০ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে এ উপজেলা।
প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উপজেলার ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৫৮ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ১২৩ জন। পুরো উপজেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০ জন।
কলেজভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, নবীনগর সরকারি কলেজ থেকে ৪২৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৮৩ জন। পাসের হার ৪২.৮৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন।
নবীনগর মহিলা ডিগ্রি কলেজে ১৭২ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৪ জন। পাসের হার ৩১.৪০ শতাংশ। এ কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে দুজন।
সলিমগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে ৩০১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৭৩ জন। পাসের হার ২৪.২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। উপজেলার সর্বনিম্ন পাসের হার এ প্রতিষ্ঠানেই।
সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ ডিগ্রি কলেজে ১৬৬ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬৬ জন। পাসের হার ৩৯.৭৫ শতাংশ।
আলীমউদ্দিন জোবেদা কলেজে ৮২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২১ জন। পাসের হার ২৫.৬১ শতাংশ।
ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ কলেজে ৩৭৭ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৫৪ জন। পাসের হার ৪০.৮৫ শতাংশ। এ কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন।
শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩৯ জন। পাসের হার ৩১.৪৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিটঘর মহেশ ভট্টাচার্য কলেজে তুলনামূলক ভালো ফলাফল হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে ১২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৭ জন। পাসের হার ৫৫.৩৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন। উপজেলার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পাসের হার।
এদিকে, বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাতজন এবং জিনদপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। উভয় প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য শতাংশ।
এ ছাড়া রাবেয়া মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৫০ শতাংশ।
সব মিলিয়ে উপজেলার ১১টি প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০ জন। এর মধ্যে নবীনগর সরকারি কলেজে তিনজন, বিটঘর মহেশ ভট্টাচার্য কলেজে তিনজন, নবীনগর মহিলা ডিগ্রি কলেজে দুজন, সলিমগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে একজন এবং ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ কলেজে একজন।
এমন ফলাফলের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নবীনগরের শিক্ষার মান ও পাঠদান ব্যবস্থা নিয়ে। কেন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পাসের হার এত কম? শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি পরিচর্যা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম কতটা কার্যকর ছিল—এসব বিষয় এখন নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ পরীক্ষা কেন্দ্র পরিবর্তন ও নকলমুক্ত পরিবেশে কঠোরভাবে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় আনছেন। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ হিসেবে এসব বিষয়কে নিশ্চিতভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রশাসনের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ।
একটি পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু একটি উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর এমন ফলাফল অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। প্রতিটি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের প্রত্যাশা, অভিভাবকের ত্যাগ এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য স্বপ্ন।
এখন সময় শুধু ফলাফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করার নয়; বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কেন শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে এবং কীভাবে শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা যায়, তা খুঁজে বের করার।
নবীনগরের শিক্ষাঙ্গন আবারও সাফল্যের পথে ফিরুক—এটাই প্রত্যাশা। আগামী দিনের ফলাফলে যেন হতাশার পরিসংখ্যান নয়, উঠে আসে মেধা, পরিশ্রম ও সাফল্যের নতুন গল্প। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ।